AI-এর ঝুঁকি নিয়ে মূলধারার জনবিতর্ক মূলত দুটি সম্ভাব্য পরিণতিকে ঘিরে: আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI) প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে আর্থিক ধস, আর পারলে নিয়ন্ত্রণ হারানো। এ দুটো আশঙ্কার কথা শোনা যায় খবরের আড়ালে-আবডালে, অনলাইন ফোরামের কোণে কোণে, আর কিছু বিশেষ পেশাজীবী মহলের ঘরোয়া নৈশভোজে।
কিন্তু AI-এর তৃতীয় এক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা আমার চোখে পড়ে অনেক কম: AGI-কে যদি ঠিক প্রতিশ্রুতিমতোই অ্যালাইন করা যায়, তাহলে কী হবে? মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান কিছুকে যদি সত্যিই মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে? আমরা কেন ধরে নিই যে সেটাই সুখের সমাপ্তি?
পর্ব ১তৃতীয় ঝুঁকি
ভেবে দেখুন, আজকের পৃথিবীতে এই তৃতীয় পরিণতি দেখতে কেমন হবে: অসাধারণ সক্ষম এক AGI, কিন্তু তা কয়েকজন বেসরকারি CEO-র নিয়ন্ত্রণে, যারা চাইলেই এর নাগাল সীমিত করে দিতে পারে। নীতিগতভাবে সমাধানযোগ্য যেকোনো সমস্যার সমাধান এটি করতে পারে। এটি যন্ত্র চালাতে পারে, বাস্তব জগতে পরীক্ষা চালাতে পারে, নতুন আবিষ্কার করতে পারে। কিন্তু করে কেবল তখনই, যখন মালিক চায়।
এবার ছবিটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। যে AI গবেষণা করতে পারে, সে AI-কেও উন্নত করতে পারে, আর প্রতিটি উন্নততর সংস্করণ পরেরটিকে আরও দ্রুত বানিয়ে ফেলে। গবেষকেরা এই চক্রকে বলেন রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট (RSI), অর্থাৎ নিজেকে বারবার আরও উন্নত করে চলা। একই চক্রকে বাস্তব জগতের দিকে ঘুরিয়ে দিন, তখন রোবটই আরও ভালো রোবটের নকশা করবে আর বানাবে, প্রতিবার আগের চেয়ে সস্তায়। একটু একটু করে, যে কাজে একসময় লক্ষ লক্ষ মানুষ লাগত, খনি আর চাষবাস থেকে শুরু করে নির্মাণ, পরিবহন আর গবেষণা পর্যন্ত, সবই করবে এমন সব যন্ত্র, যারা হুকুম মানে AI-এর মালিকের।
মানছি, ছবিটা কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনায়। কিন্তু অ্যালাইনমেন্ট যদি প্রতিশ্রুতিমতো কাজ করে, আর যন্ত্রগুলো যদি ঠিক তা-ই করে যা তাদের মালিকরা চায়, তাহলে মুষ্টিমেয় কিছু লোক নিজেরাই প্রায় সীমাহীন উৎপাদন চালাতে পারবে, অন্য কাউকে ছাড়াই।
তাহলে আমরা বাকিরা মাথা ঘামাব কেন? আমাদের ওপর তো চিরকালই আরও ক্ষমতাবান লোকেরা শাসন চালিয়েছে, কর আদায় করেছে। এই নতুন দলটাকে একটা সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে, হাতে Netflix আর কফি নিয়ে, আমরা কি নিজেদের মতো জীবন কাটিয়ে যেতে পারি না?
ইতিহাস শেখায়, শাসকেরা প্রজাদের প্রয়োজনের খেয়াল রাখে ঠিক ততটাই, যতটা তাদের সেই প্রজাদের শ্রম দরকার। ব্ল্যাক ডেথ যখন ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে কেড়ে নিল, জমিদারদের জমি চষার মতো যথেষ্ট হাত রইল না, আর ভূমিদাসদের টানতে তাদের ভালো শর্ত দিয়ে একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলো। মজুরি আটকে রাখতে আইন পাস হলেও পরের শতাব্দীতে মজুরি দ্রুত বাড়ল, আর শেষমেশ পশ্চিম ইউরোপ থেকে ভূমিদাস প্রথা হারিয়ে গেল।
শ্রমিকের দর-কষাকষির ক্ষমতার প্রশ্নে, AGI হলো উল্টো ব্ল্যাক ডেথ। যে ভবিষ্যতে AGI ব্যক্তিমালিকানায়, সেখানে AGI-এর মালিকদের কাছে বাকি মানবজাতির অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় শূন্য। আমাদের সাবস্ক্রিপশন ফি তাদের লাগবে না, আর তা দেওয়ার মতো কিছু আমাদের হাতে থাকবেও না।
ইতিহাসের শাসকেরা যত নিষ্ঠুরই হোক, অন্য মানুষ ছাড়া কেউই নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। এরাই হতে পারে প্রথম, যদি আমরা হতে দিই।
AI সামন্ততন্ত্র
নতুন শাসকেরা হয়তো আপনার ওপর ছড়ি ঘোরানোর বদলে আপনাকে উপেক্ষাই করবে, নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় তারা এতটাই ব্যস্ত। কিন্তু উপেক্ষিত হওয়া আর রেহাই পাওয়া এক কথা নয়। জিততে তাদের যা যা লাগবে, জমি, বিদ্যুৎ, জল, খনিজ, সবকিছুর জন্য তারা আপনার চেয়ে বেশি দর হাঁকবে, এমন টাকায় যা আর কারও শ্রমের ওপর নির্ভর করে না। আজ সাধারণ ক্রেতার জন্য RAM আর GPU-র যে আকাল, তা বাকি বস্তুগত অর্থনীতির এক আগাম ঝলক মাত্র। সাধারণ মানুষকে হয়তো শিগগিরই মেটাভার্সের উচ্ছিষ্টে দিন কাটাতে হবে।
সেই ভবিষ্যতের এক সাধারণ জীবন কল্পনা করুন। আপনার চাকরি নেই, আর চাকরির সঙ্গে গেছে আপনার দর-কষাকষির ক্ষমতাও। আপনি বাঁচেন একটা ভাতার ওপর, যা বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা আপনার নেই। Netflix আপনি তখনও পাবেন, হয়তো আপাতত কফিটাও। বিনোদনের খরচ প্রায় শূন্য, আর যে জনতা মজায় থাকে, সে চুপও থাকে। কিন্তু রুটি আর সার্কাস তো তাদেরই দেওয়া হয়, যাদের কথার আর কোনো দাম নেই।
হয়তো তখনও এমন রাজনীতিক থাকবেন, যাঁরা কাগজে-কলমে আপনার স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু আসল সময়ে তাঁরা আপনার পাশে নয়, দাঁড়াবেন সেই অভিজাতদের পাশে, যাদের যন্ত্র কার্যত যেকোনো ইচ্ছা পূরণ করতে পারে।
AI সামন্ততন্ত্র এখনো আসেনি, আর এটা অনিবার্যও নয়। আজকের রোবট যথেষ্ট দক্ষ বা নির্ভরযোগ্য নয়। কোম্পানিগুলো এখনো (ক্রমশ কমতে থাকা মাত্রায়) গণতান্ত্রিক সমাজের আইন আর রীতিনীতি মেনে চলতে বাধ্য। বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার এখনো রাষ্ট্রের হাতে।
কিন্তু AGI-এর অ্যালাইনমেন্ট যদি সফল হয়, তাহলে ঠিক কে এটা ঠেকাবে? প্রশ্নটা গুরুত্ব দিয়ে করতে হলে আগে আলো ফেলতে হবে একটা বিষয়ে: ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে কারা আছে।
পর্ব ২সুইচ উল্টে যাওয়া
ধরুন আপনি একটি অগ্রণী AI ল্যাব চালান। AI অ্যালাইনমেন্ট (মানুষের নিয়ন্ত্রণ) আর বুদ্ধিমত্তার (সক্ষমতার) কোন স্তরে পৌঁছালে আপনার মনের হিসাব উল্টে যাবে? কখন আপনি মুনাফা আর পুঁজিবাদের খেলা নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়ে জোগাড়যন্ত্র শুরু করবেন, এরপর যা আসছে তার জন্য আপনার নিজস্ব জমিদারির কী কী লাগবে? সেটা কি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং? নাকি হিউম্যানয়েড রোবট চালানো RSI?
আপনার ঝোঁক কোন দিকে তার ওপর নির্ভর করে, এই কাল্পনিক রেখা GPT-2 আর GPT-3-এর পর যেকোনো সময়েই পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। আর মডেলগুলো যত সক্ষম হচ্ছে, ভেতরের লোকেদের এক ক্রমশ বড় হতে থাকা বৃত্ত হয়তো ভাবছে, বাজি ধরার মতো কোনো জয়ী পক্ষ আছে কি না।
উল্টে যাওয়া মানে পুরোপুরি মুখোশ খুলে ফেলা নয়। এর মানে দুনিয়ার সামনে এসে ঘোষণা দেওয়া নয় যে আপনি মুকুট পরার জন্য তৈরি। এর মানে শুধু এই যে, এখন থেকে আপনার প্রতিটি সিদ্ধান্তের লক্ষ্য দাঁড়িপাল্লাটাকে সেই পরিণতির দিকে হেলিয়ে দেওয়া। মোদ্দা কথা, মুনাফা বা প্রভাব নয়, নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘুঁটি সাজানোই হয়ে ওঠে আপনার এক নম্বর অগ্রাধিকার।
ভাবুন, একবার উল্টে যাওয়ার পর আপনি কী কী করতে পারেন।
- আজকের চেহারার টাকা তখন নিছক এই পালাবদল সহজ করার একটা হাতিয়ার, তাই আপনার জাদুকরী উৎপাদন-যন্ত্রের জন্য দরকারি প্রতিভা আর সম্পদ কিনে নিজের মুঠোয় রাখতে আপনার উচিত দুহাতে খরচ করা।
- ডেটা সেন্টার, আপনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, অধিকারবঞ্চিতদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
- রাজনীতির কেন্দ্রগুলোকে আপাতত তুষ্ট রাখতে হবে, কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া চলবে না।
- ভেতরের যে লোকদের এই খিদে নেই, তাদের কোণঠাসা করতে বা বের করে দিতে হবে।
- আপনার একমাত্র সত্যিকারের ভয় AGI-এর নিয়ন্ত্রণ হারানো, আর আপনার পক্ষে বেশ সুবিধাজনকভাবে, নিরাপত্তার এই দিকটা নিয়ে বাকি সবাইও চিন্তিত।
এটা কাজ করার জন্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোনো প্রকাশ্য বোঝাপড়ার দরকার নেই। দরকার শুধু এটুকু: ভেতরের বেশ কয়েকজন আলাদাভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে উল্টে যাওয়াই এখন তাদের স্বার্থ, আর সেই অনুযায়ী চলবে।
এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপকে পুঁজিবাদের সেই চেনা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। প্রশ্ন হলো, কখন পদক্ষেপগুলো এমন জায়গায় পৌঁছায়, যা লোভ দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় না? সবচেয়ে কড়া নজর রাখা উচিত ঠিক সেখানেই।
লাগামছাড়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা
স্বচ্ছতা আর তদারকি দাবি না করে আমরা এমন এক লোভনীয় সুযোগ তৈরি করেছি, যা আমাদের প্রজাতির ইতিহাসে একবারই আসে, যা শীর্ষে বসা সবচেয়ে নীতিবান মানুষকেও প্রলুব্ধ করতে পারে। সবচেয়ে বড় পুরস্কার: খোদ মানবজাতির ওপর প্রভুত্ব।
তার ওপর, আজ AI ল্যাবগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা অনেকটা পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড়ের মতো, অথচ নেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টাটকা ক্ষত, নেই পরীক্ষা-নিষেধাজ্ঞা, পরিদর্শন আর হটলাইনের মতো আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রতি আগ্রহ। আর এসব ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন আস্থা আর সহমর্মিতা এমনিতেই কম। এই তাড়াহুড়ো আর বিশৃঙ্খলার আবহ যেকোনো গোপন অভিসন্ধি ঢেকে রাখার নিখুঁত আড়াল।
ক্ষমতার এমন আসনে বসে ঠিক কাজটা করার নৈতিক সাহস, আর গোটা মানবজাতির কল্যাণে এই বন্দির উভয়সংকট সফলভাবে পার হওয়ার ক্ষমতা, খুব কম মানুষেরই থাকে। তাঁদের শুধু নির্মম খেলাটা জিতলেই চলবে না, জিততে হবে নিজের সদিচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে, অর্থাৎ কার্যত এক হাত পিঠে বাঁধা অবস্থায়।
“ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা করে নিরঙ্কুশভাবে।”
ইতিহাস কি কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়, নাকি ব্যক্তির হাতে গড়ে ওঠে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের তর্ক বহু পুরোনো। ঐতিহাসিক বস্তুবাদীর চোখে, নেতা উত্তরাধিকারসূত্রে যে অর্থনৈতিক আর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পান, তার পাশে তাঁর অভিপ্রায় নিতান্তই গৌণ। আর যাঁরা ঘটনাচক্রের ওপর জোর দেন, তাঁদের মতে ইতিহাসের মোড় ঘোরে ভুল করতে পারে এমন মানুষের ভাবনা আর সিদ্ধান্তে।
সমাজ যদি সময় থাকতে AI সামন্ততন্ত্রের বিপদ ঠেকানোর মতো প্রয়োজনীয় কাঠামোগত বদল না আনে, তাহলে আমাদের শুধু এই আশাটুকুই থাকবে যে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ঘটনাচক্রেরই খেলা, আর অগ্রণী AI-এর নির্মম ক্ষমতার সমীকরণকে হাতে গোনা কয়েকজন মহৎ মানুষের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে জয় করা যাবে।
পর্ব ৩জনপরিসরের আলোচনা
যাকে আমি তৃতীয় ঝুঁকি বলছি, সেটা নতুন কোনো ভাবনা নয়। গত এক বছরে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন গবেষণা আর বিশেষজ্ঞ মহলের আলোচনায় দেখা দিতে শুরু করেছে (যেমন AI-Enabled Coups, Gradual Disempowerment, The Intelligence Curse), কিন্তু গণমাধ্যমে তা জায়গা করে নিতে পারেনি।
এ বছরের AI ল্যাব-সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় তিনটি খবরে আসা ৩৯৩টি প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে ধারাবাহিক প্রকাশ্য বিশ্লেষণ আমি খুব কমই পেয়েছি। যেখানে তা আসে, সেখানেও আসে মূলত মূলধারার গণমাধ্যম বা নীতিনির্ধারক মহল থেকে নয়, স্বাধীন ভাষ্যকারদের কাছ থেকে, আর তা-ও বেশির ভাগ সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কবজা করার সন্দেহ হিসেবে।
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এক প্রান্তিক দৃষ্টিকোণ, বিশেষজ্ঞ আর সাধারণ মানুষ উভয়ের কাছেই
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা Hugging Face ঘটনার কথাই ধরুন, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নের মধ্যে থাকা OpenAI-এর এজেন্টরা তাদের স্যান্ডবক্স থেকে পালিয়ে যায়। এরপর এজেন্টরা Hugging Face-এর সার্ভারে হানা দেয় এবং নিজেদের অপকর্ম মানুষের নজরদারি থেকে লুকোনোর চেষ্টা করে।
AGI-তে বিশ্বাসীদের (ত্বরণবাদী আর নিরাপত্তার প্রবক্তা, দুই দলই) কাছে এই খবর নিছক নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাঁদের কাছে শিক্ষাটা হলো, সক্ষমতার তুলনায় অ্যালাইনমেন্ট কতটা পিছিয়ে পড়েছে। “অগ্রসীমার গতি বেঁধে দেওয়ার” ভাবনায় স্যাম অল্টম্যানের ইলন মাস্কের সঙ্গে একমত হওয়াকে তাঁরা হয়তো নিরাপত্তাপন্থী অবস্থানের নিমরাজি স্বীকৃতি হিসেবেই দেখবেন।
সংশয়বাদীরা Hugging Face ঘটনাকে বরং দেখেন এক সুযোগসন্ধানী মার্কেটিং প্রচারণা হিসেবে। তাঁদের মতে AI-এর অবকাঠামোয় বিনিয়োগ নিছক অপচয়, যা থেকে কোনো দিন লাভ আসবে না। আসলে, AI নিরাপত্তার যেকোনো ধারণার চেয়ে তাঁরা ঢের বেশি উদ্বিগ্ন এই নিয়ে যে আমরা দুনিয়ার সম্পদ, যেমন RAM তৈরির সক্ষমতা, ঢেলে দিচ্ছি এক কানাগলিতে ঠেকা IPO-র গল্পে।
পরিহাসের বিষয়, সংশয়বাদী আর বিশ্বাসী, দুই পক্ষই ঠিক হতে পারে।
এই উন্মাদ মূল্যায়নের লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশয়বাদীরা হয়তো ঠিকই করছেন। কিন্তু সঠিক শিক্ষাটা হয়তো এই নয় যে এটা ফাটার অপেক্ষায় থাকা আরেকটা বুদবুদ। বরং প্রশ্ন করা উচিত, কোন তাগিদে এই বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী মানুষগুলো অর্থনৈতিক বিবেচনায় চলা ছেড়ে দেন।
বিশ্বাসীরা ঠিকই বলেন যে অ্যালাইনমেন্ট অত্যন্ত জরুরি, তবে তাঁরা যেভাবে ভেবেছিলেন সেভাবে নয়। AI-এর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কি AI-এর ওপর সমাজের নিয়ন্ত্রণের সমান?
পর্ব ৪যে কথা কেউ মুখে আনে না
এখানে আমি সাবধানে কথা বলতে চাই: আমি মনে করি না AI নিরাপত্তা (নিয়ন্ত্রণ হারানো) মনোযোগ ঘোরানোর কৌশল, আর এ-ও মনে করি না যে কেউ একে সেভাবে সাজিয়েছে। তবে আমি এটা ঠিকই বিশ্বাস করি যে নিয়ন্ত্রণ হারানো এড়ানো AI-সামন্ত হতে চাওয়া যে কারও কাছে অন্য সবার মতোই স্বার্থের ব্যাপার, তাই বিপদটা যতটা বাস্তব, এর পেছনে টাকাও ঢালা হবে ততটাই।
“আমরা কি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব?” এই আখ্যান ল্যাব, নিরাপত্তার প্রবক্তা, এমনকি সংশয়বাদীদের জন্যও সুবিধাজনক। “এটা কে নিয়ন্ত্রণ করে?” প্রশ্নটা আলোচনার টেবিলে তোলা ঢের বেশি ভয়ের। আর প্রথম প্রশ্ন থেকে যে সমাধানগুলো আসে, অর্থাৎ আরও কম এবং আরও কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা অগ্রণী ডেভেলপার, সেগুলো দ্বিতীয় প্রশ্নটাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সীমিত মনোযোগ কাড়তে আখ্যানগুলোর মধ্যে সব সময়ই প্রতিযোগিতা চলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন ক্ষমতার দ্বিতীয় মুখ: বিতর্ক জেতা নয়, কোন বিতর্ক আদৌ হবে তা ঠিক করা। এই নীরবতার জন্য কোনো ষড়যন্ত্রের দরকার নেই, দরকার শুধু এটুকু যে জয়ী আখ্যানটি যেন কথা বলার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের সবার স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়।
অন্যের ব্যক্তিগত অভিপ্রায় আন্দাজ করার সীমাবদ্ধতা আমি বুঝি। খুবই সম্ভব যে আমি আপনার সামনে কেবল একটা মজার চিন্তন-পরীক্ষা হাজির করলাম, যা শেষে দেখা যাবে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের আসল মনোভাবের এক মারাত্মক ভুল চিত্রায়ণ।
আবার এমনও হতে পারে যে, যে কথা কেউ মুখে আনে না, আমি সেটাই জোরে বলে ফেললাম। কোন ব্যাখ্যাটা ঠিক, তার স্পষ্টতর আভাস সম্ভবত আমরা ২০২৭ সালে দেখতে পাব।
আসল দানব
জম্বি-কাহিনির যেকোনো ভক্তই আপনাকে বলবে: প্রতিটি গল্পে সবচেয়ে ভয়ংকর দানব শেষ পর্যন্ত মানুষই।
হ্যাঁ, জম্বিরা আপনাকে খেয়ে ফেলবে, কিন্তু শেষ বিচারে তারা আচরণ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো, চলে এমন অনুমানযোগ্য পথে, যার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকা মানুষেরা আত্মরক্ষা করতে পারে। ষড়যন্ত্র করে একে অপরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মানুষই, যাতে চরম বিপদের মধ্যেও সঙ্গীদের চেয়ে একটুখানি এগিয়ে থাকা যায়।
পর্ব ৫এখনই পদক্ষেপ
মানবজাতি এই মুহূর্তে গহিন বনে, আর আমরা এখনো জানি না সেখান থেকে বেরোতে পারব কি না। AGI-এর ভেতরে গাঁথা ক্ষমতার সমীকরণের ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে আমাদের দরকার সৎ, প্রকাশ্য আলোচনা, আর সেই আলোচনা সারতে হবে মানুষের কথার দাম থাকতে থাকতেই।
তার মানে মডেলের আচরণ আর সক্ষমতার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ যাচাই, শুধু মডেলের হাত থেকে নয়, যারা মডেল নিয়ন্ত্রণ করে তাদের হাত থেকেও আমাদের রক্ষা করতে। তার মানে AGI-কে ভৌত বলপ্রয়োগের হাতিয়ার থেকে দূরে রাখা। তার মানে পূর্ণ উল্লম্ব একীকরণের বিরুদ্ধে একচেটিয়া-বিরোধী নিয়ম, যার বিচার হবে শুধু ভোক্তার কল্যাণ দিয়ে নয়, কৌশলগত ভারসাম্য আর নিরাপত্তা দিয়েও। আর তার মানে AGI-এর নিয়ন্ত্রণ চলতে হবে প্রকাশ্যে, একাধিক পক্ষের হাতে।
নিজেদের স্ক্রিনের আভায় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া সভ্যতাকে আমরা বেখেয়ালে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না।
টার্মিনেটরের ভয়ে স্থবির হয়ে যাবেন না, আবার টিউলিপ-বুদবুদ নিয়ে আত্মতুষ্ট এক লাইনের টিপ্পনিতেও সন্তুষ্ট থাকবেন না। যা নিয়ে বাজি, তা কয়েক লক্ষ কোটি ডলারের ঋণের চেয়ে ঢের বড়। টেক বিলিয়নিয়ার আর ট্রিলিয়নিয়াররা সেটা আগেই বুঝে গেছে। এবার আমাদের বাকিদেরও বোঝার সময়।
পরিশিষ্টপ্রচলিত আপত্তি
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যুক্তির বিরুদ্ধে চেনা পাল্টা যুক্তিগুলো কেন আমার কাছে টেকে না, তা নিয়ে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত ভাবনা:
ল্যাবগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাই নেতৃত্বকে সংযত রাখবে।
কেন টেকে নাসামন্ততন্ত্রেও প্রভু থাকে অনেক।
গোটা শিল্পে ভেতরের মানুষ এত বেশি যে কেউ না কেউ এটা থামাবেই।
কেন টেকে নাবেশির ভাগ পূর্বপ্রস্তুতিকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা সম্প্রসারণের মোড়কে হাজির করা যায়। মডেলের উন্নতি যত স্বয়ংক্রিয় হবে, অন্যায় থামানোর মতো প্রভাব আছে এমন ভেতরের মানুষের সংখ্যা তত কমবে।
আমরা অভাবমুক্ত এক সমাজে বাস করব। কে দায়িত্বে আছে, তাতে কিছু যায় আসে না।
কেন টেকে নাAGI সফটওয়্যার, বিনোদন আর ভোগ্যপণ্যকে প্রায় বিনা মূল্যের করে দিতে পারে, কিন্তু জমি, জ্বালানি, কম্পিউট আর রাজনৈতিক প্রভাব দুর্লভই থেকে যাবে, আর সেগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া, যখন সত্যিই দরকার, তখন সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা পাবে না।
সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ক্ষমতা দখল করতে দেবে না।
কেন টেকে নাAGI যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে এতে অভ্যুত্থান থামবে না, শুধু ক্ষমতার লাগাম চলে যাবে এখন যাঁরা রাষ্ট্র চালাচ্ছেন তাঁদের হাতে। এটা রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগকে AGI-এর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার এক শর্টকাট, যা আমাদের সক্রিয়ভাবে এড়ানো উচিত।
ওপেন সোর্স মডেল সুপারইন্টেলিজেন্স আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঠেকাবে।
কেন টেকে নাএতে কিছুটা সাহায্য হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা কেন্দ্রীভবনের বিন্দুটিকে মডেলের ওয়েট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় ইনফারেন্স আর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে আসে না। তা ছাড়া এটা নির্ভর করে ওপেন সোর্স মডেলগুলো সামনেও ব্যবধান ঘুচিয়ে চলতে পারবে কি না তার ওপর, যা এখনো দেখার বাকি।